কবির কদর নেই জীবদ্দশায়, কবির কবর দেয়া হয় না।
থাকলে,এপিটাফ কদর দিত/কোন নিষিদ্ধ প্রেমিকার মতো।

mayukh speaks

My photo
kolkata, west bengal, India
A media professional and a wanderer by passion. Blogger and social observer. loves to watch world films and hear different music genre.

Thursday, July 13, 2017

| বর্ষা বাড়ি |

| বর্ষা বাড়ি |

---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

বর্ষা এলো বম্বে জুরে। অঝোর। সারা রাত। সকাল ও। কাল রাত থেকে এসেছে সাদা হয়ে।আমার জানালার গ্রিলে, ওই যে কাপড় মেলার দড়িতে, কাঁচে, কব্জাতে, রঙ চটে যাওয়া প্লাস্টিক এর ক্লিপে।

ভোরবেলা থেকে শুয়ে আমার ঘর আগলে ছিল। এখন ভিজে আছে চারপাশ। এক বৃষ্টিজলের পিঠে আরেক বৃষ্টিজল।

আমাদের শোয়ার ঘরের জানালার ঠিক ওপরে এসি আউটলেট এ দুটো পায়রা থাকে। আজ ওরা বড্ড জুবুথুবু।

তিনটে পুচকি গাছ কিনে এনেছিলাম। পাতাবাহার, টগর আর এলোভেরা। ছোট্ট পাতা, গুটলি গুটলি চোখে চেয়ে থাকতো। অনেকটা মাটি জুরে মুখ বাড়িয়ে থাকতো আমি অফিস যাওয়ার আগে। অনেক রাতে বাড়ি ফিরলে একবার চোখ খুলে দেখে নিত। আর কার্বন দীর্ঘশ্বাস এ ছাড়তো।

ইদানীং বড় হচ্ছিল। চোখে মুখে আকাশ ছোঁয়ার স্পষ্ট ছাপ ছিল। আজ দেখি অনেকাংশ সবুজ বেশী, বড় হয়েছে, বেশ লাগছে।

দূরে একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে একটা ন্যাংটো বাচ্চা খালি গ্রিল বাজাচ্ছে বৃষ্টি পেয়ে। আর এক ফ্ল্যাটের আলুথালু বউদি দেখছি মেলা কাপড় তুলে নিতেই ব্যস্ত। রান্না চাপানো আছে বোধহয়। আতপ চাল খায় ওরা।

এই সময় সব শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। ঝমঝম ঝমঝম ক্রমাগত। এবার রান্নাঘর এ কৌটোয় চাল তোলার শব্দ শোনা যাবে, ডাল এ কাঁকর বাছার শব্দ ও। চপ বোর্ড এ আলু, কপি, পেঁয়াজ ছুরি দিয়ে কাটার শব্দ। কান পাতো গ্যাস জ্বালানো শব্দ শুনতে। চাপা ধুপ করে একটা শব্দ। পেঁয়াজ রসুন মিহি করার শব্দ। কড়াই ওভেন এ রাখলে কোন শব্দ হয়না। মিঠে শব্দ হয় মশলা তেল এক সাথে এলে। ঝমঝম ঝমঝম ক্রমাগত ঝাঁঝ। আজ খিচুরি হবে।

ঘরে অনেক কাপড় মেলা এখন। বাস্প প্রচুর চার দেওয়াল জুরে। এসব রবিবার খিচুরি, মামলেট, আনুষঙ্গিক ভাজা খেয়ে বর্ষা ঘুমের। একপাশ ফিরে বালিশ এ মাথা দিয়ে আরেক কান দিয়ে বৃষ্টি আওয়াজ শোনার।

এ শহর বছর এ চার মাস বর্ষার মঙ্গলকাব্য শোনে। আজ সেরকম এক দিন। মেঘলা। বাড়িতে বন্দি থাকার। সারাদিন।

---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

উথালপাতাল শহর জোড়া ঢেউ

উথালপাতাল শহর জোড়া ঢেউ /
মেঘ বসেছে ফ্ল্যাট বাড়িদের গায়।

ছাতার নিচেই নগরযাপন হবে/
কংক্রিট ও তো বর্ষা হতে চায়।

-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

বম্বে, মেরিন ড্রাইভ ২০১৭

ভারত পাক যুদ্ধং হেব্বি

| ভারত পাক যুদ্ধং হেব্বি |

--- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

আজ রবিবার।  আকাশ আংশিক মেঘলা। রোদ্দুর যেটুকু তাতে বারুদ বারুদ গন্ধ। আজ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হবে। বাইশ গজ এ পারমানবিক বিস্ফারণ হবে দেশাত্মবোধের।

আজ দিকে দিগন্তে ভারত আমার ভারতবর্ষ এড্রেনাল রাশ। বদলা নেওয়ার শপথ চ্যানেল  এ চ্যানেল এ। এক একটা ডেলিভারি মোক্ষম চাল পাকিস্তানকে পৃথিবীর ম্যাপ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার। প্রতিঘাতততততত!!!!!!!

কোন সালে কতগুলো ভারতীয় মেরেছিল পাক সেনা, কতগুলো বুলেট লেগেছিল মুম্বাইবাসীদের মেরুদন্ডে, কটা সেনার কাটা মুন্ডু সাক্ষী ছিল পাক হিংসার- আজ গুনতি হবে। প্রতি ওভারে। আমরা হিসেব রাখবো পকোড়া খেতে খেতে।

আজ বউদের বড় ব্যস্ততা। এ যুদ্ধে সেবাদাসী তারা। পুরুষ সিংহ তাঁর বন্ধুদের বাড়িতে ডেকেছে। বোতল বোতল দেশাত্মবোধ ঢালা হবে, সাথে আদর করে ভাজা পকোড়া, এক বুক রাগ, রাতে জেলুসিল।

বাজার থেকে দরদাম করে রেয়োজি খাসি আনা হচ্ছে। মালের দোকানে দোল এর দিন এর মত লাইন। পেঁয়াজ, রসুন,আদা, দই এর প্যাকেট, দেশাত্মবোধের পুড়িয়া। জাতীয়তাবাদী তেল এ রাঁধুন, উপরে ছড়িয়ে দিন কাশ্মীর হামারা হ্যা অহমিকা। স্বাদ খোলতাই হচ্ছে। বাজারের ব্যাগের ভিতরে লাজে রাঙা হুইস্কির বোতল। বউনি হবে সন্ধে নামার আগে। গেলাস বের করে রাখা।

আমার ফ্ল্যাট এর ওয়াচম্যান বৃদ্ধ মানুষ। সুরক্ষা কম, গল্প বলে বেশি। ৯২ এর দাঙ্গা দেখেছে, ৯৩ এর বম্বে ব্লাস্ট দেখেছে, ২৬/১১ দেখেছে। আজ বড় উসখুস করছে তিনটের আগে বাড়ি ফেরার। ম্যাচ দেখবে। জিতলে দারুন হাততালি আর সিটি দেবে। যেরকম বিএসএফ জওয়ানরা দেবে স্লোগান। ভারত মাতা কি জয়।

টিভির সামনেই এরা যুদ্ধ করে। মধ্যরাতে আয়নার সামনে বিপ্লব। এরা জানে সরকার আদপে চুলটিও ছিঁড়বে না প্রতিবেশীর। বিরয়ানী খেয়ে আসবে, বিদেশে হাত মিলিয়ে আম্মির খবর নেবে। প্রশ্ন করলে চুপ করিয়ে দেবে- সিয়াচেন মে হামারে জওয়ান মর রহে হে।

এ অভিশাপ আমাদের। রক্ত আমাদের হাতে লেগে। ক্ষত দেশ ভাগের স্মৃতিতে। এখানে আর কোন উপায় নেই টিভির সামনে বিপ্লব করা ছাড়া।

যাদের একজন ও কাশ্মীর এ গুলিবিদ্ধ হয়নি, যাদের স্ত্রী দাঙ্গার আগুন এ গনধর্ষিতা নয়, যার বন্ধু ২৬/১১ তে নিহত নয়,তাদের আজ মউকা মউকা!

আয়নার সামনে অসহায় যুদ্ধরত। এক সন্ধে আচ্ছে দিন। বাদ বাকিতো জাতীয়তাবাদী উচ্ছাস এ পিটিয়ে মারা, মুদ্রাবন্দি ভারত ও চুলবুল চুলবুল ধুম ধারাক্কা। হু হাঃ  হু হাঃ!

--- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

ভিজতে শিখছে ধুসর কলকাতা

মাছের বাজার ইলশেগুঁড়ি ভীড়/
শহর দখল রামধনু সব ছাতা।

বৃষ্টি মেঘে চরৈবেতি হবে/
ভিজতে শিখছে ধুসর কলকাতা

--- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

| সিঁদুর ধোয়া বৃষ্টি ভিজবো চল |

| সিঁদুর ধোয়া বৃষ্টি ভিজবো চল |

--- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

একটু আগে বৃষ্টি হল খুব/
সাবধানী প্রেম ছাতার আস্তরনে।

কথায় প্রথম ভিজতে শিখিয়ে ছিলি/
বুঝিয়েছিলি আগুন ছোঁয়ার মানে।

এখন আগুন জ্বলতে থাকে রোজ/
ছাতার নিচে একলা বাসস্থল।

আবার কি আজ মনখারাপি হবি?
সিঁদুর ধোয়া বৃষ্টি ভিজবো চল।

©- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

| বিক্রিত করিয়া মুখ, গন পেটাইতে বড় সুখ |

| বিক্রিত করিয়া মুখ, গন পেটাইতে বড় সুখ  |

-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

আমরা কমবেশি সবাই গন পেটাতে ভালোবাসি। টিভি থাকুক বা না থাকুক।  একজন গর্ততে পরে থাকতে দেখলে, আচ্ছা করে পেছন, সামনে, খচ্চরের মত মেরে দিই। এতে খারাপ কিছু নেই। সবজান্তা কাক বা দেশপ্রিয় নায়ক এতে খারাপ কিছু দেখে। যেরকম বাম, ধর্ম নিরপেক্ষ নেতার মেয়ে মুসলিম কে নিকা করলে চাপকানো জরুরী।

কোন দোষ না করলেও কিছু মানুষের মুখ দেখলেই খিস্তি করতে ইচ্ছে করেনা? বা কোন মেয়ে কে অযথা হয়রানি করতে?  বস্ হয়ে?  সুযোগ বুঝে ভিড় বাসে নরম পেছনে হাত দিতে?  জানি মাংসের পিন্ড, তবে নিশ্চয়ই আলাদা অনুভূতি,  নয়তো ইচ্ছে করেই বা কেন ।

আখ্লাক বা জুনেইদ নামক মুসলমান লোকটিকে যারা পিটিয়ে মারল তারা সবাই পূজো করে? যারা আমার ছেলেবেলার বেকবাগান এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে তসলিমা দাহ করেছিল, তারা কেউ তার বই পড়তে শিখেছে? আমি কিন্তু ইয়াসমিন এর সাথে গোস্ত খেয়েছি।

আপিস ফেরত বাবারা ও শোষন এর শিকার বুঝি । নয়তো ছেলেদের ওরম ধোলাই দেবে? নিশ্চয়ই মাসের শেষ এদিকে শালার বিয়ে। ওদিকে মিউচুয়াল ফান্ড এর টাকা বাকি। মার শালা ব্যাট দিয়ে।

কোনদিন এক আফ্রিকার তানজেনিয়ার মেয়ে কে উলঙ্গ করে, তার গাড়ি তে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। তো একদিন মুসলিম এক লোককে কেবল মুসলিম বলে মারা হল। কোনো কারণ ছাড়াই । গরুর মাংস খেয়েছিল হয়তো।

আচ্ছা আমরা কি এর সমালোচনা করতে পারি?  আমরা তামিল, তেলেগু  সব ঘেঁটে ঘুঁটে সাউথ ইন্ডিয়ান বানিয়ে দিইনি?  বা মনিপুর, অসম হোক বা মায়ানমার, এদের চিঙকি বলি না? মুসলমানিতেই আমরা একজোট হই।

আসুন রোগ প্রতিরোধ করি এবার । রোগী কল্যাণে নিউজ প্রিন্ট প্রচুর খরচ হল।

বাঘের বাচ্চা

বাঘের বাচ্চা

গোটা দেশে লাইন লেগেছে। কে আগে গো সন্তান হবে। হা রে রে রে। হাম্বা হাম্বা কলরব, নিরামিষাশী বন্দনা। এ বড় প্রতিযোগিতামূলক দেশত্ববোধ। এদিকে লাইন দিয়ে লাভ নেই। ভাতে আর ভাতে হাবাতে বাঙালি আমি। আয়নার সামনে বিপ্লব করি। মাঝরাতে চমকে উঠি প্রতিক্রিয়াশীল স্বপ্ন দেখে। সব আলো জ্বেলে নিশিকালীন হিসু সারি। 

তবু তো আমার ঘরেই বিসমিল্লাহার সানাই বাজে উলুর সাথে সিঁদুরদানে। বুক চিতিয়ে সামলে রাখি জাহির, কবীর, ইসমাইলকে। যার যা মন চায় তাই খায় আমার পৃথিবীতে। আমি সীমান্তরেখায় যুদ্ধ করতে পারিনা, মসজিদ ভাঙতে পারিনা, ট্রেন জ্বালাতে পারিনা, জুমলাবাজিতেও অক্ষম।  তার জন্য ধক লাগে।

আমার ছাপান্ন ইঞ্চির ছাতি নেই। থাকার মধ্যে আছে লালচে জামা। গোটা গোটা অক্ষরে দীর্ঘশ্বাস-

বাঘের বাচ্চা।

| এখন নয়তো কখন? |

| এখন নয়তো কখন? |

---ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

গোটা রাজ্য জুরে মাংসপোঁড়া গন্ধ। জমে থাকা রাগের উষ্ণতা খেটে খাওয়া ঘামের সাথে দড় দড় করে পরছে আমার আপনার গায়। আপনি স্টার জলসা আর ঘন্টাখানেক এর মাঝে টের পাচ্ছেন না। এখন যদি দারুন রাগে যুদ্ধ না হয়, তবে কখন হবে?

গোটা রাজ্যে বিগত এক দশকে একটাও নতুন ভারী শিল্প আসেনি। কোন উল্লেখযোগ্য বহুজাতিক সংস্থা অফিস খোলেনি, সেক্টর ফাইভেই আইটি স্বপ্ন শেষ। কোন চাকরী নেই, ফোট। এখন যদি রগ না চটে তবে কখন?

একটা বিশাল বৃদ্ধাশ্রম। নাম কলকাতা। প্রবাসের বহু ছেলেমেয়ে এই বৃদ্ধাশ্রমকে নিজের ঘর বলে মনে  করে। বাড়ি বানায়ে দিল্লী,বম্বে,লন্ডন।

কলকাতায় রমরমা বাড়ে আয়া সার্ভিস, ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার এর হোম ডেলিভারি, একাকিত্ব দূর করতে স্কাইপ শেখানো, ফিজিওথেরাপি, ডিলাক্স বৃদ্ধাশ্রম এর। এগুলোই রমরমা শিল্প। এখন অভিমান নয়তো কখন?

অন্য রাজ্যে টাটা বিদায় নিলে শোক পালন হয়, এখানে দেবীর জন্ম হয়। দেবী উদযাপনেই খুশি। বদল এখন নয় তো কখন?

কিছু লুম্পেন ধর্মের নামে ঘর জ্বালাবে, পুলিশ মারবে, হেলমেট না পড়ে বাইক চালাবে, অস্ত্র মিছিল করবে আর তাদের মাথা মেরে গুঁড়িয়ে দেবো না? তাদের তোষন করতে হবে? এখন?

বিএ পাশ, এমএ পাশ করছে ছেলেমেয়েরা। পুরুষতান্ত্রিক বাংলায় প্রেমিকের হাতে রুমাল ধরিয়ে মেয়েগুলো বিয়ে করে মুম্বাই, দিল্লী, লন্ডন চলে যাচ্ছে আর ছেলেগুলো সিন্ডিকেট বা ওলা উবের এর লাইসেন্স নিচ্ছে। খুব বেশী হলে পৌরসভায় কাজ। অন্য রাজ্যে এই শিক্ষাগত যোগ্যতায় ম্যানেজার হয় লোকে। ফি বছর ১৫% ইনক্রিমেন্ট নিয়ে।

কোন নতুন চ্যানেল নেই, খবরের কাগজ নেই, আপিস, স্টার্টআপ,স্বপ্নঘোর বৃদ্ধি নেই। থাকার মধ্যে হতাশা চায়ের দোকানে, ক্যারাম আর তাস পেটানোয়।

এখন রাগ হবে না তো কখন হবে? বাদুরিয়ার আগুন আমার বাংলা নয়। আমার বাংলা বিসমিল্লার সানাই এ শুভ দৃষ্টি, ব্রাহ্মণ দলিত মুসলিম নির্বিশেষে বিরিয়ানিপ্রেম, টপ শটে হাওড়া ব্রিজ।

আসুন না, যেটা যার ভুল সেটা বলি। যদি মসজিদ ভেঙে দেওয়া হয় আসুন ঘেন্না করি একসাথে, যদি মন্দিরে গরুর মাংস ছুড়ে দেওয়া হয় সেটার ও নিন্দা করি।

আসুন না দুই ধর্ম থেকেই হাত ধরি শপথ নিতে। কেউ যদি বেশী পায়, পাওয়ার হিসেব নাও কেন না অনেক লোক ভালো সব পায়না। লড়াইটা চাকরি পেতে, দু বেলা খেতে, পড়তে পাওয়ার জন্য হোক। মন্দির, মসজিদ তৈরি করলে শিল্প আসেনা। আগুন জ্বালালেও আসেনা।

উন্নয়ন এর রথ যাত্রা কবে হবে এই পোড়া দেশে? কবে দাঙ্গা বাঁধবে বিশ্বমানের কারখানা, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প পেতে নিজের মাটিতে। দেখবেন প্রত্যেক কারখানা তখন মন্দির, মাজার হবে। ধর্ম হবে উন্নয়নের গতি।

যারা অস্ত্র মিছিল করছে, ঘর জ্বালাচ্ছে, রথ পোঁড়াচ্ছে, মাজারে ঢিল ছুঁড়ছে, তাদের চাকরিজীবন দিন। ব্যাবসা দিন। ব্রোকার, ডিলার, রিটেইলার হতে দিন। মতাদর্শ দরজা খুলুন। শিল্প বৃদ্ধি আনুন। ধন্দা সে বড়া কোই ধরম নেহি হোতা!

এবার কাজ দিন। অনেক অনেক কাজ। নয়তো অলস মস্তিষ্কজাত পিটিয়ে মারা, দাঙ্গা বাধানো, গুজব ছড়ানো চলতেই থাকবে আমার বাংলায়। ভিক্টোরিয়া, দার্জিলিং, খোয়াই, লালমাটির বাংলায়।

© ---ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

| গুজব |

| গুজব |

---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

গুজব বলতে ছোটবেলায় ভাবতাম আনন্দলোক আর নবকল্লোল এর প্রচ্ছদ কাহিনী। রসালো, ধারনানির্ভর, দুপুরবেলা বালিশ চেপে বা সন্ধের ক্যারাম ঠেকের মাখোমাখো খোরাক। গ্লসি ছাপার অক্ষরগুলো কখন যেন আমার বাড়ি, মায়ের শাড়ী, ভাতের থালা, বাবার পিটিয়ে মারা লাশের সাথে জ্বলতে থাকলো। গুজবে।

গুজবেই তো যুদ্ধ লাগে। গোল্লাছুটের মাঠ, প্রিয় শহর, পোষা বেড়ালছাড়া হতে হয় লেখককে। পরে থাকে না পাওয়া স্বীকৃতি, অপমান, এক ডক্টর কি মউত!

গুজবকে ইদানীং আঙুলে ছোঁয়া যায়, মোবাইল থেকে মোবাইল ছিটিয়ে দেওয়া যায়। সরকার নাকি এবার ৫০টাকার নোট বাতিল করবে, গণেশ ফের দুধ খাবে, ফেসবুক দাম দিয়ে ব্যাবহার করতে হবে, জিএসটির জন্য পোস্ট আপিসে সুদের হার ৪% হবে ইত্যাদি।

গুজবের গরু তুলসী গাছে ওঠে, মুসলিম ছেলের পাশে বসে করুণভাবে, মায়ের রুপ নেওয়া মাত্র তাকে নিধন করা হয় চাপাতি দিয়ে, তারপর ট্রেনে ধরা পরে নির্ঘাত কোন বীর হিন্দু পরিত্রাতার হাতে।

গুজবেই তো রক্ত গরম হয়। ভোজপুরি ছবির বলাতকার দৃশ্য বেমালুম চালিয়ে দেওয়া হয় হিন্দু নারীকে প্রকাশ্য রাস্তায় নগ্ন করা হয়েছে বলে। পাল্টা লোক জড়ো হয়, নবীর ছবিতে বিকৃতি করা হয়েছে মাইকে প্রচার করে। মন্দিরে গরু ছোঁড়া হয়েছিল, পবিত্র গ্রন্থকে কি সাংঘাতিক সব....

গুজবেই তো ১৮৫৭ এর সেপাই বিদ্রোহ। দাঁতে কাঁটতে হবে গরু ও শুয়োর। গুজবেই তো সংবাদ শিরোনাম দাদরি। মুর্শিদাবাদ এ শিশুচোর সন্দেহে মহিলাকে পিটিয়ে মারা। বাদুরিয়ায় ঘৃণায় ঘৃতাহুতি।

গুজবের মিউজিয়াম হয়? সাজিয়ে রাখা যায় রাজ্যের যত গুজব দেওয়াল এ দেওয়ালে? নন্দীগ্রামে সরকার সব জমি কেঁড়ে নেবে জোর করে, সোনারপুরে বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে ভেরীর মাছ মরে যাবে, পোলিওর টিকা নিলে শিশু বিকলাঙ্গ হবে, বহুজাতিক শিল্প এলেই পুঁজিবাদী কালো হাত পিছু পিছু আসবে আর আমরা সংশোধনবাদী হয়ে যাবো।

গুজবে আমার শাঁখ আর আজানের সন্ধেবেলা, কাওয়ালির তালি শেষে কীর্তনের খোল, মেহতাব আর দীপেন্দুর ফুটবলমাঠ, বিসমিল্লার সানাই, ড্রাইভার চাচার পুজোর ভোগ চেটেপুটে খাওয়া, আয়াত আর লালন সাঁই এর শপথ চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে। আমি তখন পৈতে কানে প্যাঁচাচ্ছি, আমি তখন ফেজ টুপি মাথায় পড়ে তৈরি। ঘর ভাঙবো।

গুজব নিয়ে অনেকদিন আগে একটা ছোট ছবি দেখেছিলাম। এক হিন্দু নাপিতের দোকানে এক মুসলিম খদ্দের, বন্ধু ও বটে সে, দাড়ি কাটতে এসেছে। টিভিতে খবরের চ্যানেল চলছে, সিয়াচেন মে জওয়ান মরছে, কেউ কেউ পাক পতাকা ওড়াচ্ছে, বাকি জায়গায় না কামানো দীর্ঘ দাড়িতে সন্দেহ।

নাপিত তার খদ্দের বন্ধুর সাথে হাজার গল্পে মশগুল ক্ষুর চালানোর আগে। চুটিয়ে আড্ডা ক্রীম মাখাতে মাখাতে, তোয়ালে চাপিয়ে, চেয়ারে হেলান দিয়ে।

আচমকা সামনের রাস্তায় কয়েকজন ফেজ টুপি পড়া ছেলে তলোয়ার হাতে এক গেরুয়া ধুতি পড়া লোককে মারতে শুরু করলো। এক সময় তরোয়াল ও ঢুকিয়ে দেওয়া হল।

সেলুনে নাপিত ক্ষুর হাতে, বন্ধু খদ্দের চোখ বন্ধ করে। নিশ্চিন্ত ক্রীম মাখানো গাল। গলার কাছ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পরছে। টিভিতে তখনো খবরের চ্যানেল চলছে, সিয়াচেন মে জওয়ান মরছে, কেউ কেউ পাক পতাকা ওড়াচ্ছে, বাকি জায়গায় না কামানো দীর্ঘ দাড়িতে সন্দেহ।

সবাইকে চমকে দিয়ে এক বাজখাঁই চিৎকার- কাটটটট, যে গেরুয়া ধুতির লোকটাকে ফেজ টুপির ছেলেগুলো কোপাচ্ছিল, সে উঠে বসলো। বুকে টমেটো সস লাগা। ছবির শুটিং ছিল।গুজব।

সব ঘটনা শুটিং হয়না। আসুন সময় থাকতে শুধরে নিই নিজেদের। গুজবে কান না দিয়ে হাতে হাত ধরে রুখে দিই দাঙ্গাবাজদের। আয়াত বা মন্ত্রোচ্চারণ হোক মানবতার। খেটে খাওয়ার। গুজবের না।

---© ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

প্রাচীন মাটিচাপা প্রেমপত্র

প্রাচীন মাটিচাপা প্রেমপত্র/
ইদানীং গজিয়েছে ঘাস/

বিবাহিত দুপুরবেলা তাঁর/
স্মৃতিঠোঁটে  জল দিয়ে যাস!।

-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

কতটা ঘৃণার পাহাড় পেরিয়ে

কতটা ঘৃণার পাহাড় পেরিয়ে যাত্রী/
পৌছবে লাশ কফিনে অমরনাথ।

তোমার জেহাদ আমার বাঁচার আর্তি/
সন্ত্রাসীদের কাপুরুষতাই জাত।

©-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

| আল্লা কে নাম |

| আল্লা কে নাম |

-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

চাপাতি দিয়ে প্রতিস্পর্ধা কোপানো হয়। চাপাতি শ্রমের চুল্লিতে সেকে সামান্য সব্জি দিয়ে খাওয়া ও হয়।

সাতজন অমরনাথ যাত্রীকে যে বুলেটে ঝাঁঝরা করলো তার নাম ইসমাইল। পেশায় সন্ত্রাসী। আল্লার দোহাই দিয়ে কালাশনিকভ চালায়।

বাকি ৬৩ জন যাত্রীকে যে উপস্থিত বুদ্ধি খরচ করে প্রাণে বাঁচালো তার নাম সেলিম। পেশায় বাসচালক। পেটের তাগিদে পূণ্যার্থীদের বাস চালায়।

আপনারাই ঠিক করুন আপনারা কোনদিকে?

©---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

| এয়ারটেল প্রমিস করিলো |

| এয়ারটেল প্রমিস করিলো |

লজ্জিত #Airtel অবশেষে  ক্ষমা চাইলো। "প্রমিস" করিলো আর এ ভুল হইবে না।

দুই বাংলা ও বিশ্বজোড়া বাঙালি আবার প্রমাণ করিলো যে হিন্দু, অহিন্দু, দলিত, ব্রাহ্মণ, চামার, উচ্চবর্ণ নয়, ভাষার অহং লইয়াই দুনিয়ার বাঙালি বাঁচে। কোলবালিশ চেপে ঘুমোয়।

এই ভাষাকে অসম্মান করিলে চটিয়া যায় বাঙালি, খোঁচিয়া যায় প্রবল, জেলুসিল চিবাইয়া ধ্বনিত হয় কালো হাত ভাঙিয়া দাও, ফোনের লাইন কাটিয়া দাও। দাও দাও দাওওওও।

এভাবেই অক্ষয় থাক বাঙালি। ইহাদেরই তো মানায় নিজ মাতৃভাষায় কথা বলার দাবীতে যুদ্ধ ঘোষণা করা। দু দুখান জাতীয় সংগীত লেখা।

উঁহু না সোনা, ধর্মের নামে বাংলা ভাগ হইতে দিবো না। প্রমিস!

©---- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

Saturday, June 24, 2017

| ধর্মনিরপেক্ষ বিরিয়ানি |

| ধর্মনিরপেক্ষ বিরিয়ানি |

----ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ

ধর্মনিরপেক্ষ বিরিয়ানি বানানো সহজ নয়। তবে কলকাতা বানাতে পারে। ব্রাহ্মণ, দলিত, কাফের, কবীর, সন্ত, শেখ এক পাতে খায়। সস্তায় পুষ্টিকর, অরাজনৈতিক।

কোলকাতা ওয়াজিদ আলি শাহের। বিরিয়ানির। বিরিয়ানির নরম আলুর। কাঠি রোলের। এখানে চাড্ডি, চাড্ডির অতি দেশভক্তি আর নিরামিষাশী হিন্দি হিন্দু, হিন্দুস্থানের জায়গা হল কবে?

ওয়াজিদ আলি শাহ বড় খুশবুদার খানার সৌকিন ছিলেন। শোনা যায় বিরিয়ানিতে আলু তার কল্যানেই। ছোড় চলে লক্ষ্ণৌ নগরী, ওয়াজিদ কো দিল কে নসদিক কলকাত্তা মিলি।

অবস্থা খারাপ, পয়সা নেই বললেই চলে, ব্রিটিশ পেনশেন ও অনিয়মিত কিন্তু নবাব এর বিরিয়ানি, গোস্ত, শাহি টুকরা চাই। হাত ধোয়ার রুপোর গামলা হাতে লোক চাই, অল্প মিঠে, অনেকাংশ লালচে হবে নরম পাতার পান চাই, পিক ফেলার দান।

নবাবের ফরমায়েশ। মেটিয়াবুরুজ থেকে মোমিনপুর, বন্দর, ময়দান, ডোমজুর, অধুনা হেস্টিংস দৌড় দৌড়। এখান থেকে চাল তো ওই বাজার থেকে জাফরান ও মশলা। স্বাদের খোঁজ, ফেলে আসা লক্ষ্ণৌর হেঁসেলের দীর্ঘশ্বাস।

লক্ষ্ণৌর অওয়াধি বিরিয়ানির অনুপ্রেরণা নিয়েই কোলকাতায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিরিয়ানি। "মুসলিম নবাবের" কল্যানে। জনগনতান্ত্রিক ভাবে এর রান্না শিখেছে শহর। ভরপেট ৮০টাকা প্লেট। যে বিরিয়ানি সিপিএম, তৃনমূল, বিজেপি, হিন্দু, মুসলিম, নিমাই বা নেওটিয়া নির্বিশেষে খায় চেটে, চুষে, ঢেকুর তুলে।

ঐতিহ্যশালী পুক্কি প্রথা মেনেই রান্না কোলকাতা বিরিয়ানি। সাথে ফেলে দেওয়া হয় আলু আর ডিম পেট ভরাতে, মাংস পরিমাণ কমাতে। বাংলা কখনোই বড়লোক নয়। দেশভাগ, দাঙ্গা, অনাহার, অন্ন চাই প্রান চাই, বেকারত্ব, চলবে না। আলু প্রয়োজন। পেট ভরে।

মশলার সঙ্গে আধসেদ্ধ করা হয় অল্প মাংস, ভেজে রাখা হয় আলু, আলতো মাখানো হয় দারচিনি, জয়িত্রী ও কেসর। সেদ্ধ করা হয় সুগন্ধী বাসমতী চাল। কোলকাতা তাই খায়।

ঈদের আগে পয়সা জোগার হয়ে যায়। করতে হয়। ঈদের দিন রাখা থাকতো এলাহি দাওয়াত। বাসমতি চাল আধ সেদ্ধ করা হয় মসলিন ব্যাগে ভর্তি মশলা দিয়ে তারপর একটা বড় থালায় সেই আধ সেদ্ধ ভাত ভালো করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় |

অন্য একটা পাত্রে ডিম, মুরগি, পাঁঠার মাংসও আধ সেদ্ধ করা হয় আওয়াধি সব মশলা যেমন শা জিরে,জায়ফল,মেস,দারচিনি,লবঙ্গ ,এলাচ আর তেজ পাতা দিয়ে |

আমন্ড বাদাম গরম জলে ভিজিয়ে রাখা হয় যতক্ষণ না খোসা কুঁচকে যাচ্ছে | সঙ্গে ঘি,গোলাপ জল আর দুধে ভেজানো জাফরান হাতের কাছে রাখা হয়েছে |

এবার আসল কাজ। ডিম খানা পুরে দেওয়া হবে মুরগিতে। মুরগি পুরে দেওয়া হবে পাঁঠার পেটে। এবার পুরো আয়োজন এর মধ্যিখানে একটা বড় গর্ত বানিয়ে আস্তে আস্তে মাংসের স্টক ঢেলে দেওয়া হবে যাতে ভাত আর মাংস একসাথে রান্না হয়|

তারপর অনেকটা ঘি যাতে ভাতটা পুরো ঢেকে যাবে | এরপর হালকা করে গোলাপ জল দিয়ে হাড়ির মুখ ভালো করে আটা মাখা দিয়ে সিল করে দেওয়া হল | বিরিয়ানি দম পুক্ত করে ধীরে ধীরে অল্প আঁচে চাপিয়ে দেওয়া হয় | শেষের পনেরো মিনিট জলন্ত কয়লা হাড়ির মাথায় চাপিয়ে দেওয়া। এই কোলকাতাতেই। শহরবাসী একসাথে এক বিশাল পাত্রে খেত। নাই বা হল মুসলমান নাই বা রাখলো এক মাসের রোজা।

ভাবুন তো একদিন এই শহর থেকে এই বিরিয়ানির হাঁড়িটা, ওই একসাথে বসে গোস্ত খাওয়া, ওই কান পাতলে মিলে মিশে থাকার ইতিহাস, এই রাঁধুনি, ওই নবাব এর পরিবার, মোছলমান সব লোকেদের খেদিয়ে বার করে দেওয়া হল? দেশদ্রোহী বলে?

বর্গী  ও বিজয়বর্গীয়রা রান্নাঘর অবধি চলে এসেছে। হারে রে রে রে অস্ত্র মিছিল। ইমতিয়াজ আর আমি এঁঠো হাতে হাত রেখে। বিরিয়ানির থালা পরে। কার হাঁড়িতে কি রাঁধা হচ্ছে তার জরিপ চলছে। পছন্দ না হলেই পিটিয়ে মারা হবে। সজাগ থাকুন খেতে খেতে। একসাথে। বিসমিল্লা।

©-- ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ